অনলাইন ডেস্ক
১৮ জুলাই ২০২৪—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত বিকেল। সেদিন আমরা হারাই মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধকে। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন তিনি। আজ সেই বেদনার দিনের এক বছর পূর্ণ হলো।
এই দিনে ভাই মুগ্ধকে স্মরণ করেছেন তাঁর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগময় স্ট্যাটাসে তুলে ধরেছেন ভাই হারানোর কষ্ট, স্মৃতি আর ভালোবাসার কথা। নিচে লেখাটি সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো:
—
আমাদের জন্ম ৯ অক্টোবর ১৯৯৮, আমরা যমজ ভাই। ছোটবেলা থেকেই সবাই বলতো—দু’জনই নাকি গোলগাল আর দেখতে প্রায় একরকম। অনেক সময় সুযোগ নিয়েছি—একজন আরেকজন সেজে পরীক্ষা দিয়েছি, কাজ করেছি, কেউ ধরতেই পারেনি।
আমাদের মধ্যে সবসময় প্রতিযোগিতা চলত, তবে পড়ালেখায় মুগ্ধ সবসময় একটু এগিয়ে ছিল। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে অন্যসব জায়গায় আমরা সমানভাবে লড়েছি। আর ও ছিল অসম্ভব সাহসী। ছোটবেলা থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত একসঙ্গে সারাদেশ ঘুরেছি—কী করিনি আমরা একসাথে!
১৭ জুলাই ২০২৪, ওর মৃত্যুর আগের রাতেও আমরা একসঙ্গে কাজ করছিলাম। প্রায় রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করে ঘুমাতে যাই। প্রতিদিনের মতো সেদিনও মশারি টানানো নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। একটু পরেই ও নিজেই ডেকে তুলল আমাকে—এমন আগে কখনো হয়নি। ঘুম থেকে তুলে আম্মু নিয়ে কথা বলল—কীভাবে নিজের টাকায় আম্মুকে একটা ফ্ল্যাট কিনে দিবে, এসব নিয়ে।
তারপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ভিডিও দেখিয়ে বলল, “এখন খুলনায় থাকা উচিত ছিল, জুনিয়রদের সাহায্য করতে পারতাম।” ওর কথার আর শেষ নেই। আমার তখন হাত কেটে সেলাই পড়েছিল, ব্যথায় বিরক্ত হয়ে বললাম, “ঘুমাতে দে।” সেদিনই ছিল ওর সঙ্গে আমার শেষ রাত।
পরদিন সকালে আন্দোলনে যাওয়ার সময় মুগ্ধ আমার একটা জামা পরে বের হয়। আর যখন শুনি ও গুলিবিদ্ধ হয়েছে, আমি তখন ওর একটা জামা পরে বের হই। হাসপাতালে গিয়ে দেখি—ও ঘুমিয়ে আছে যেন! বোঝার উপায় নেই, সে আর নেই। মা যাঁর গর্ভে আমাদের দু’জনকে একসঙ্গে এনেছেন, তিনি কীভাবে একজনকে একা চলে যেতে দেন?
সারা রাত ওর মরদেহের পাশেই বসে ছিলাম—যেমন প্রতিদিন রাতে ওর পাশে ঘুমাতাম। পার্থক্য শুধু একটাই—ওর শরীরে তখন প্রাণ ছিল না। যতবার ওকে দেখেছি, মনে হয়েছে ওর শরীর থেকে আলো বের হচ্ছে। জীবনে ওকে এতটা সুন্দর আর দেখিনি।
মা-বাবা তখনো জানতেন না। তারা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসছিলেন। ভাবছিলাম, মা যখন মুগ্ধকে দেখবেন, তখন কী হবে! সকালে তারা এলো। মুগ্ধর নিথর দেহ দেখে মা চুপচাপ কপালে চুমু খেলেন। সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল—এক মা কপালে চুমু দেয়, আর আরেক মা, যাকে আমরা দেশ বলি, সে কপালে গুলি চালায়।
আমাদের বড় ভাই শাবল ভাই—সেই শক্ত মানুষটিকেও সেদিন শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছি। মুগ্ধ মারা যাওয়ার খবরটা বাবা-মা যেন না জানেন, তাই পুরো রাস্তা অভিনয় করে গেছে, আর সেই কষ্ট জমে থাকা কান্না—সেদিন একসাথে বেরিয়ে এলো।
মা বলতেন—“তোমাদের দু’জনকে একসাথে মানুষ করতে আমার জীবনটা পানি হয়ে গেছে।” যাঁদের যমজ সন্তান আছে, তারা জানেন এ কষ্ট কেমন।
আজ আর কিছু বলছি না। পরে বলব, কীভাবে মুগ্ধকে কবর দেওয়া হলো, কীভাবে আমাদের ব্ল্যাঙ্ক চেক ও হুমকির মাধ্যমে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
একটাই কথা বলি—যারা বেঁচে থাকে, তাদের দায় বেশি। যেমন বলা হয়, ‘সত্য মরে না।’ তেমনি, মুগ্ধর গল্পও শেষ হবে না—কারণ ওর স্বপ্নগুলো এখন আমাদের নিঃশ্বাসে বেঁচে আছে।
