অনলাইন ডেস্ক
গত ১৩ জুন ভোরে ইসরায়েল ইরানে আগাম হামলা চালায়। হামলার সময় বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল। লক্ষ্য ছিল ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, গবেষণাগার এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বাসা।
এই অভিযানে ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ৯৭৪ জন ইরানিকে হত্যা করেছে। পাল্টা ইরানি হামলায় ইসরায়েলে নিহত হন ২৮ জন।
ইসরায়েল বলছে, তারা আত্মরক্ষার জন্য আগাম হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ইরান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (IAEA)-র প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্য নেই।
এ হামলা এমন সময় হয়েছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল।
আগাম হামলা: বৈধ না বেআইনি?
আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিগত দিক থেকে আগাম যুদ্ধকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়:
প্রি-এম্পটিভ যুদ্ধ: তাৎক্ষণিক ও নিশ্চিত হুমকির প্রতিক্রিয়া
প্রিভেন্টিভ যুদ্ধ: ভবিষ্যতের আশঙ্কাজনক হুমকি ঠেকাতে আগাম ব্যবস্থা
শুধুমাত্র প্রথম ধরনের যুদ্ধই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। যেমন “ক্যারোলাইন সূত্র” অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য আগাম হামলা তখনই বৈধ, যখন হুমকি হয় তাত্ক্ষণিক, অপরিহার্য এবং অন্য কোনো বিকল্প না থাকে।
ইরানে ইসরায়েলের হামলা এসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির শেষ ধাপে ছিল না, কূটনৈতিক চেষ্টা পুরোপুরি শেষও হয়নি। তাছাড়া পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কারণে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ভয় ছিল, যা সামরিক প্রয়োজনীয়তার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে
জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করে। কেবলমাত্র ৫১ অনুচ্ছেদে আত্মরক্ষার সুযোগ রয়েছে, তাও তখনই, যখন একটি দেশ সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হয়। ইসরায়েলের আগাম হামলার যুক্তি কোনো স্বীকৃত আন্তর্জাতিক আইনে বৈধতা পায় না। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এই হামলাকে ‘নগ্ন আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এমন নজির তৈরি হলে ভবিষ্যতে যে কোনো দেশ একই অজুহাতে আগাম হামলা চালাতে পারে—যেমন, চীন তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বা পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে।
হুমকি আর বাস্তব হামলার ফারাক
ইসরায়েলের সমর্থকেরা হয়তো বলবেন, ইরান ইসরায়েলের অস্তিত্বের হুমকি দিচ্ছিল। ইরানি নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোকেও সমর্থন দিচ্ছেন।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়, কথা আর কাজ এক নয়। ঘৃণাবাচক বক্তব্য দিলেই কেউ আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে পড়ে—এমন যুক্তি দাঁড় করালে বিশ্বে অশান্তি ছড়িয়ে পড়বে। তখন প্রতিটি উসকানিমূলক কথা যুদ্ধের অজুহাত হয়ে উঠবে।
বিশ্ব যখন ড্রোন নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করছে, তখন যুদ্ধ হয়ে উঠছে সহজ বিষয় আর শান্তি হচ্ছে ব্যতিক্রম। এমন পরিস্থিতিতে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
—
লেখক: হোসেইন দাব্বাঘ, সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডন
(সূত্র: আল–জাজিরা ইংরেজি, সংক্ষিপ্ত রূপে অনূদিত)
