– জাহেদ উর রহমান
৫ আগস্টের পর আমি বারবার প্রশ্ন করেছি, সরকার কি একটি ‘স্বাধীন আওয়ামী গোপালগঞ্জ’ গঠনের বিষয়টি মেনে নিয়েছে? শেখ হাসিনার পতনের পর গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতাকে হত্যা এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, যারা ভারতে পালিয়ে যেতে পারেনি, তাদের অনেকেই এখন গোপালগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছে। তাই জনগণের প্রত্যাশা ছিল, সরকার মানবাধিকার রক্ষা করে কঠোরভাবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তা দেখা যায়নি।
সরকার যদি গোপালগঞ্জের পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন থাকত, তাহলে বুঝতে পারত এনসিপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেখানে অশান্তি হতে পারে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় যদি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেই সরকারকে সতর্ক করতে না পারে, তাহলে সেটা বড় ধরনের ব্যর্থতা। আর যদি আগেই জানত, তবুও এনসিপির কর্মসূচি ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ না নেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—সরকার কি ইচ্ছা করেই এসব ঘটতে দিয়েছে?
গোপালগঞ্জের সহিংসতায় চারজন নিহত হয়েছেন। একজন আহত ব্যক্তির সঙ্গে পুলিশের অমানবিক আচরণের প্রমাণও পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়াবাড়ি করেছে কি না, বিশেষ করে মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
আমরা চাই শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক—even সবচেয়ে বড় অপরাধীর ক্ষেত্রেও। যদিও শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন ও বিদায়ের সময় তাঁর দল যেভাবে সহিংসতা চালিয়েছে, তা অনেক কষ্টের বিষয়। তারপরও, আওয়ামী লীগের সমর্থকদেরও সাধারণ নাগরিকের মতো ন্যায্য অধিকার রয়েছে।
এই ঘটনার পর এনসিপির একজন নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, একটা জেলায় যদি রাজনীতিকদের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে সরকার কীভাবে সারা দেশে নির্বাচন করবে? কথাটা অপ্রাসঙ্গিক নয়। কারণ, এরকম একটা ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বহুদিন ধরেই চলছে।
এর আগে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামও বলেছিলেন, দেশে নির্বাচন করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। জামায়াতের আমিরও এমন মন্তব্য করেছেন। লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠকের পর জনগণের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হলেও, এখন পরিকল্পিতভাবে বলা হচ্ছে যে নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, বিচার ও সংস্কারের ঘাটতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেখিয়ে কেউ কেউ নির্বাচন পেছানোর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, গোপালগঞ্জে কি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সহিংসতা তৈরি করা হলো, যাতে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার যুক্তি আরও জোরদার করা যায়? যদি ফেব্রুয়ারিতেও নির্বাচন না হয়, তাহলে ২০২৬ সালের জুনে কীভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে?
যদি নির্বাচন পেছানো হয়, আর তাতে কোনো দলের লাভ হয় বা আসন ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হয়, সেটা রাজনৈতিক হিসাবের অংশ হতে পারে। কিন্তু নির্বাচন পেছানোর বিষয়টি যদি দীর্ঘমেয়াদে ভোটবিহীন শাসনের কৌশল হয়, তাহলে তা দেশের জন্য ভয়াবহ হবে।
সরকার বহুবার বড় বড় সংস্কারের কথা বলেছে—যেমন রাখাইনে মানবিক করিডর চালু বা চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সাধারণ দায়িত্ব পালনে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
গোপালগঞ্জের ঘটনা সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এই ধরনের পরিস্থিতির কারণে যদি নির্বাচন পেছাতে হয়, তাহলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। এটি শুধু সরকারের ব্যর্থতা নয়, বরং এটা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র বলেও সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার সামনে এখন বড় পরীক্ষা। পরে পদত্যাগের কথা বলার আগে, এখন তাঁর মূল দায়িত্ব হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে নিরাপদ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করা।
—
লেখক: জাহেদ উর রহমান
পরিচয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(এই লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব)
